নিজস্ব প্রতিবেদক: হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীর বহন করা স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক সংগঠনের স্থানীয় দুই নেতার গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটির একটি অংশ সামনে এলেও, পুরো ঘটনার নেপথ্যে আরও বড় কোনো চক্র সক্রিয় ছিল কি না—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ছিনতাইয়ের ঘটনা নাও হতে পারে। স্বর্ণ দেশে আনার প্রক্রিয়া, এর প্রকৃত মালিকানা, বহনকারীদের ভূমিকা এবং শুল্ক পরিশোধের বিষয়গুলো তদন্ত করলে ঘটনার ভিন্ন চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বিয়ের স্বর্ণ’ দাবিকে ঘিরে প্রশ্ন
মামলার বাদীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণগুলো পারিবারিক প্রয়োজনে দেশে আনা হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও সূত্রের বক্তব্যে এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, মামলার বাদী মো. সুমন স্বর্ণ ব্যবসা বা স্বর্ণ পরিবহনের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বর্ণ পৌঁছে দেওয়ার কাজও করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী যাত্রীদের মাধ্যমে স্বর্ণ দেশে আনার ঘটনায় শুল্ক ও কর ফাঁকির অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যবহার বা পারিবারিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যিক পরিমাণের স্বর্ণ দেশে আনার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনাতেও স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রে আইন ও শুল্ক সংক্রান্ত বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
ছিনতাইকারীদের কাছে এত তথ্য গেল কীভাবে?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—স্বর্ণ বহনকারী ব্যক্তি কখন বিমানবন্দর থেকে বের হবেন, তার কাছে কতটুকু স্বর্ণ রয়েছে এবং তিনি কোন পথে বা কীভাবে বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করবেন—এসব তথ্য অভিযুক্তদের কাছে কীভাবে পৌঁছাল?
বিমানবন্দরের মতো উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকায় একজন যাত্রীর গতিবিধি ও মূল্যবান মালামাল সম্পর্কে এত নির্দিষ্ট তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহলের অনেকে।
তাদের মতে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বাইরে কোনো তথ্যদাতা ছিল কি না, সেটি তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
তবে বিমানবন্দর প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে।
সাজানো ছিনতাইয়ের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার দাবি
ঘটনাটি নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে—স্বর্ণ বহনকারী বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ পরিকল্পিতভাবে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না।
কিছু সূত্রের ধারণা, মূল্যবান স্বর্ণ আত্মসাৎ কিংবা এর প্রকৃত উৎস গোপন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজানো হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনাটির প্রতিটি পক্ষের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, অবস্থান তথ্য এবং বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।
যেসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি
ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা—
মামলার বাদীর প্রকৃত পেশা ও পূর্ববর্তী স্বর্ণ লেনদেনের তথ্য।
স্বর্ণ বহনকারী ব্যক্তির ভ্রমণ ও কাস্টমস সংক্রান্ত রেকর্ড।
উদ্ধার বা ছিনতাই হওয়া স্বর্ণের প্রকৃত মালিকানা।
স্বর্ণ দেশে আনার ক্ষেত্রে আইন ও শুল্ক বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
ঘটনার আগে ও পরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের তথ্য।
বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ।
ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সন্দেহভাজনদের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না।
‘গ্রেপ্তারেই শেষ নয়, বের করতে হবে নেপথ্যের চক্র’
রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তের একটি অংশ এগিয়েছে বলে মনে করা হলেও, ঘটনার পুরো নেটওয়ার্ক এখনো উন্মোচিত হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি ঘটনাটির সঙ্গে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ স্বর্ণ পরিবহন, তথ্য পাচার কিংবা পরিকল্পিত ছিনতাইয়ের কোনো যোগসূত্র থেকে থাকে, তাহলে কেবল মাঠপর্যায়ের অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেই প্রকৃত রহস্যের সমাধান হবে না।
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্বর্ণের উৎস, মালিকানা এবং পুরো ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল—তা উদঘাটন করা জরুরি। অন্যথায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান ও মূল্যবান মালামাল ছিনতাইয়ের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীরা আড়ালেই থেকে যেতে পারে।
এ ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী বক্তব্যের দিকে এখন তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্টরা।