তামান্না আক্তার হাসি: আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে মো. কামরুল খান (৪৪) নামে এক ব্যক্তির পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা জেলা। ঘটনার সংবাদ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. আল-আমিন (৩৬) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে নিহতের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলের বাথরুমের প্যানের ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ আশুলিয়া থানাধীন বাসাইদ রাজু সিটির সামনে আমির আলীর বাড়ির ভাড়া দেওয়া একটি তালাবদ্ধ টিনশেড কক্ষ থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হয়। বিষয়টি বাড়ির মালিক তাহেরুন্নেসা পুলিশকে জানালে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের পচনধরা মরদেহ দেখতে পায়।
খবর পেয়ে পিবিআই ঢাকা জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে যায়। পিবিআইয়ের নিজস্ব ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিহত ব্যক্তি খুলনার তেরখাদা থানার নয়াবারাসাত এলাকার মৃত করিম খানের ছেলে মো. কামরুল খান (৪৪)।
এ ঘটনায় নিহতের মামাতো ভাই মো. জামিল শেখ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা নং-১০০, তারিখ ১৭ আগস্ট ২০২৬, দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় মামলা করেন। পরদিন ১৮ আগস্ট পিবিআই ঢাকা জেলা স্ব-উদ্যোগে মামলাটি অধিগ্রহণ করে এবং পুলিশ পরিদর্শক মো. জামাল উদ্দীন বিপিএমকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে মো. আল-আমিনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে পিবিআই খুলনার সহযোগিতায় ১৭ আগস্ট দুপুর ১টা ৫ মিনিটে খুলনার তেরখাদা থানার নয়াবারাসাত গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে নিহত কামরুলের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
পরে গ্রেফতার আল-আমিনের দেখানো মতে আশুলিয়ার ঘটনাস্থলের বাথরুমের প্যানের ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল-আমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তিনি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, নিহত কামরুল ও আল-আমিন দুজনই খুলনার তেরখাদা এলাকার বাসিন্দা এবং ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের পরিচিত। কাজের সন্ধানে তারা গত ৮ আগস্ট খুলনা থেকে ঢাকার আশুলিয়ায় আসেন। পরদিন বাসাইদ এলাকায় ৪ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় একটি কক্ষ নেন এবং রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেন।
কাজ করে পাওয়া টাকা শেষ হয়ে গেলে ১৪ আগস্ট রাতে আল-আমিন কামরুলের কাছে টাকা চান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি হয়। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আল-আমিন সবজি কাটার ছুরি দিয়ে কামরুলের গলায় আঘাত করেন এবং গামছা দিয়ে তার গলা বেঁধে দেন। এতে কিছুক্ষণের মধ্যে কামরুলের মৃত্যু হয়।
পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাথরুমের প্যানের ভেতরে ফেলে দেন আল-আমিন। পরদিন সকালে কক্ষে তালা দিয়ে তিনি নিজ বাড়ি খুলনায় চলে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম জানান, কামরুল ও আল-আমিন কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সময় বাড়ির মালিক তাদের কোনো পরিচয়পত্র বা মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করেননি। ফলে প্রাথমিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তবে পিবিআইয়ের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিহত ও অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএমের তত্ত্বাবধানে মামলাটির তদন্ত চলছে।