ছনিয়াঃ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG sector) প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং বিদ্যমান শ্রম পরিস্থিতি—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু একসঙ্গে বিবেচনা করে সমন্বিত করণীয় নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আজ (১৪ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি আমদানির একটি বড় অংশও এই শিল্পকেন্দ্রিক হওয়ায় রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্যে RMG খাতের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আলোচনায় উঠে আসে, শিল্পে সৃষ্ট মোট মুনাফা ও শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরির মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট বৈষম্য। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (Global Supply Chain) বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি এখনো ন্যায্য ও টেকসই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ প্রায়শই শ্রমিকদের ওপর পড়ে, যার ফলে তাদের জীবনমান উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ শ্রমিক এই খাতে কর্মরত, যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী। নারী শ্রমশক্তির এই বিপুল অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় অর্জন হলেও নিরাপদ কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
সংলাপে জানানো হয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার সংকট ও রপ্তানি বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে গার্মেন্টস শিল্প বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ২৫৮টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এক লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
এ অবস্থায় প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিদ্যমান শ্রম পরিস্থিতিকে আলাদা করে না দেখে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তাদের মতে, সময়ের দাবি হলো একটি বাস্তবসম্মত, শ্রমিক-কেন্দ্রিক এবং টেকসই কৌশল গ্রহণ।
সংলাপে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স (AFWA)-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোট বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাক শ্রমিক সংগঠন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সহযোগী সংগঠনগুলোকে একত্র করেছে। ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, সংগঠনের অধিকার ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য। AFWA প্রথমবারের মতো সীমান্ত পেরিয়ে একটি Living Wage গণনার মডেল তৈরি করেছে এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, আজকের এই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তি, জলবায়ু ও শ্রম—এই তিন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে গার্মেন্টস শিল্পকে টেকসই ও মানবিক পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।